Police vs উকিল
এই ৫টা কথা পুলিশকে বললেই আপনার জামিন কঠিন হয়ে যায়
— সেখ শানাওয়াজ আলী | অ্যাডভোকেট | কলকাতা হাইকোর্ট
অনেক সাধারণ মানুষ মনে করেন যে তিনি যেহেতু নির্দোষ, তাই পুলিশের সামনে সত্য কথা বললে তাঁর কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, থানায় বা পুলিশের সামনে বলা কিছু সাধারণ কথা পরবর্তীতে তদন্তের নথিতে এমনভাবে লিপিবদ্ধ হয়, যা আদালতে জামিনের সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধেই সবচেয়ে শক্ত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সংবিধান আপনাকে নীরব থাকার অধিকার দিয়েছে, কিন্তু সেই অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই অধিকাংশ মানুষ নিজের অজান্তেই নিজের জামিন কঠিন করে তোলে।
প্রথম মারাত্মক কথা হলো—“হ্যাঁ, ঘটনাস্থলে আমি ছিলাম।” এই বক্তব্য পুলিশের কাছে খুব সাধারণ মনে হলেও, আইনের চোখে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই একটি কথার মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে তিনি ঘটনার সময় ও স্থানে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে পুলিশ আদালতে বলে যে অভিযুক্তের উপস্থিতি প্রমাণিত এবং সেই কারণে তাঁর বিরুদ্ধে prima facie involvement আছে। CrPC, 1973-এর Section 161 এবং নতুন Bharatiya Nagarik Suraksha Sanhita, 2023-এর Section 180 অনুযায়ী পুলিশ তদন্তকালে যে বক্তব্য লিপিবদ্ধ করে, তা সরাসরি স্বীকারোক্তি না হলেও জামিনের পর্যায়ে আদালত সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে। সুপ্রিম কোর্ট একাধিক মামলায় স্পষ্ট করেছে যে জামিনের সময় আদালত কেবল দোষ-নির্দোষ নয়, অভিযুক্তের ঘটনার সঙ্গে সংযোগ (nexus) দেখেও সিদ্ধান্ত নেয়।
দ্বিতীয় বিপজ্জনক কথা হলো—“আমি একটু ভুল করেছি, কিন্তু কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না।” সাধারণ মানুষ মনে করেন, এতে দায় কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি partial admission বা আংশিক স্বীকারোক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। Evidence Act, 1872-এর Section 17 থেকে 21 অনুযায়ী যেকোনো admission আদালতে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এই ধরনের বক্তব্য জামিন শুনানিতে প্রসিকিউশনকে সুযোগ দেয় আদালতকে বোঝানোর যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, শুধু mens rea বা উদ্দেশ্যের মাত্রা বিচারাধীন। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জামিনের পর্যায়ে আদালত যদি দেখে যে অভিযুক্ত নিজেই কার্য সংঘটনের কথা স্বীকার করেছেন, তাহলে custodial interrogation প্রয়োজন হতে পারে—এই যুক্তিতে জামিন নাকচ হতে পারে।
তৃতীয় যে কথাটি জামিনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ক্ষতিকর, তা হলো—“আমি পুলিশকে পুরো সহযোগিতা করব, যা বলবেন তাই করব।” এই বক্তব্য আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ মনে হলেও, বাস্তবে এটি অভিযুক্তের আইনি সুরক্ষা দুর্বল করে দেয়। কারণ পুলিশ এই কথার উপর ভিত্তি করে আদালতে যুক্তি দেয় যে অভিযুক্ত ইতিমধ্যেই তদন্তে অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সুতরাং তাঁর কাছ থেকে আরও তথ্য উদ্ধারের জন্য হেফাজতে নেওয়া প্রয়োজন। CrPC, 1973-এর Section 41 এবং 41A, এবং নতুন BNSS, 2023-এর Section 35 অনুযায়ী গ্রেপ্তার ও নোটিস সংক্রান্ত বিধান থাকলেও, এই ধরনের বক্তব্য পুলিশকে “custodial necessity” দেখানোর সুযোগ করে দেয়। সুপ্রিম কোর্ট Arnesh Kumar বনাম State of Bihar মামলায় গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের কথা বললেও, অভিযুক্তের নিজের বক্তব্য অনেক সময় সেই সুরক্ষাকে দুর্বল করে দেয়।
চতুর্থ বিপজ্জনক কথা হলো—“আমার মোবাইল, চ্যাট, ব্যাঙ্ক সব চেক করে নিন।” এই বক্তব্য দিয়ে অভিযুক্ত কার্যত নিজেই তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে দেন। CrPC, 1973-এর Section 102 এবং নতুন BNSS, 2023-এর Section 106 অনুযায়ী পুলিশ সম্পত্তি বা ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করতে পারে, কিন্তু তার জন্য আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা আবশ্যক। অভিযুক্ত স্বেচ্ছায় সম্মতি দিলে পরে জামিনের সময় আদালত মনে করতে পারে যে ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত এখনও সম্পূর্ণ হয়নি এবং সেই কারণে অভিযুক্তকে হেফাজতে নেওয়া প্রয়োজন। Supreme Court-এর Selvi বনাম State of Karnataka মামলায় আত্মঅভিযোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা (Article 20(3)) স্পষ্ট করা হলেও, স্বেচ্ছায় দেওয়া বক্তব্য অনেক সময় সেই সুরক্ষাকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
পঞ্চম এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক কথা হলো—“আমার কোনো আইনজীবী লাগবে না, আমি নিজেই সব বুঝিয়ে দেব।” এই একটি বাক্যের ফলেই অধিকাংশ মানুষ অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েন। সংবিধানের Article 22(1) অনুযায়ী প্রত্যেক অভিযুক্তের আইনজীবীর সাহায্য নেওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকার ত্যাগ করলে পুলিশ একতরফাভাবে তদন্ত পরিচালনা করে এবং অভিযুক্তের বক্তব্য নিজেদের মতো করে নথিভুক্ত করে। পরবর্তীতে জামিন শুনানিতে সেই নথিই আদালতের সামনে হাজির হয়, যেখানে অভিযুক্তের বক্তব্য তাঁর বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে যায়। সুপ্রিম কোর্ট বহুবার বলেছে যে আইনজীবীর সহায়তা ছাড়া দেওয়া বক্তব্য অভিযুক্তের জন্য মারাত্মক হতে পারে, বিশেষ করে জামিনের প্রাথমিক পর্যায়ে।
এই কারণেই মনে রাখতে হবে—থানায় সাহস নয়, আইন জানাটাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। পুলিশের সামনে চুপ থাকা অপরাধ নয়, বরং সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার। সঠিক সময়ে সঠিক আইনি পরামর্শ না নিলে, নির্দোষ মানুষও নিজের মুখের কথায় নিজের জামিন কঠিন করে তোলে।
Advocate Sekh Sanawaz Ali
Sheresta Advocates & Solicitors | Sekh Sanawaz Ali
Comments
Post a Comment